আধ্যাত্মিক জগতের এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব হলেন শ্রীশ্রীস্বামী নিগমানন্দ পরমহংসদেব। আমরা তাঁকে জেনেছি একজন কঠোর সংযমী, বেদান্তের অদ্বৈত তত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত এবং তন্ত্র-যোগ-প্রেমে সিদ্ধ এক জগদ্গুরু হিসেবে। বাইরের দিক থেকে তিনি অত্যন্ত রাশভারী, গুরুগম্ভীর এবং কড়া শাসকের মূর্তিতে ধরা দিলেও, তাঁর বুকের ভেতর যে কী এক স্নেহময়ী মায়ের হৃদয় লুকিয়ে ছিল, তা কেবল তাঁর অন্তরঙ্গ ভক্তরাই জানতেন।
আজ আপনাদের শোনাব সেই কঠোর সন্ন্যাসীর ভেতরের এক পরম স্নেহময় রূপের কথা। এই গল্পগুলোর উৎস হলো লেখিকা নারায়ণী দেবী (যাঁকে ঠাকুর আদর করে ‘লীলা’ ডাকতেন)-র লেখা অমূল্য গ্রন্থ “নীলাচলে ঠাকুর নিগমানন্দ”। লেখিকা একেবারে ছোটবেলা থেকে ঠাকুরের সান্নিধ্যে পুরীর ‘নীলাচল কুটির’-এ বড় হয়েছেন। তাঁর স্বচক্ষে দেখা এবং শোনা ঘটনাগুলো থেকে আমি আজ এমন ৫টি গল্প বেছে নিয়েছি, যেখানে একজন সন্ন্যাসীর খোলস ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে এক শাশ্বত ভক্তপ্রেমী রূপ। আসুন, সেই অমূল্য গল্পগুলোর স্বাদ গ্রহণ করি।
১. বিমলা মায়ের বিদায়বেলা: নির্লিপ্ত সন্ন্যাসীর চোখে জল
১৩২০ সালে মেদিনীপুর ও বর্ধমান অঞ্চলে এক প্রবল বন্যা হয়। সেই বন্যায় সর্বস্বান্ত হয়ে চার সন্তানসহ এক অসহায় বিধবা রমণী, করুণাবালা দাসী, স্বামী নিগমানন্দের শিষ্যদের দ্বারা উদ্ধার পেয়ে আসামের সারস্বত মঠে এসে আশ্রয় পান। তাঁরই সর্বকনিষ্ঠ কন্যাটি হলো বিমলা, যে কিনা মাত্র তিন বছর বয়সে মঠে এসেছিল।
মঠের এই ছোট্ট মেয়েটি ছিল অত্যন্ত দুরন্ত, আর ঠাকুর তাকে যেমন শাসন করতেন, তেমনি ভালোবাসতেন। আদর করে তিনি তাকে ডাকতেন ‘বিমু’। ধীরে ধীরে বিমলা বড় হলো এবং ১৩২৭ সালে মঠের এক সেবকের সাথেই ঠাকুর তার বিয়ের ব্যবস্থা করে তাকে কন্যাদায় থেকে উদ্ধার করলেন।
১৩২৯ সালের মাঘ মাস। স্থির হলো, বিমলা এবার পাকাপাকিভাবে তার শ্বশুরবাড়ি যাবে। যাওয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন। নতুন জামাকাপড়, বাক্স-প্যাঁটরা পেয়ে বিমলা তো মহাখুশি—শৈশব থেকে মঠে বড় হওয়া মেয়েটির কাছে এই নতুন ঐশ্বর্য যেন স্বপ্নের মতো।
অবশেষে যাওয়ার দিন ঘনিয়ে এল। দরজায় ঘোড়ার গাড়ি প্রস্তুত, মালপত্র সব তোলা হয়েছে। বিমলা ঘোমটা দিয়ে বউ সেজে গাড়িতে উঠে বসল। খড়ম পায়ে ঠাকুর নিজেই দাঁড়িয়ে থেকে সব তদারকি করলেন। গাড়ি এবার ছাড়বে। হঠাৎ ঠাকুর গাড়ির পাদানিতে একটা পা রেখে, দরজার দুই দিকে দুই হাত দিয়ে একটু ঝুঁকে পড়লেন। তিনি বললেন, “সাবধানে যেও সব, পৌঁছান সংবাদ দিও।”
বিমলা অবাক হয়ে দেখল, ঠাকুরের মুখখানা লাল হয়ে উঠেছে, যেন ফেটে জল পড়বে। রুদ্ধ আবেগে গলা ভারী হয়ে এসেছে। তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, “বিমু, এতদিনে তাহলে সত্যিই ছেড়ে চললি আমায়?” এই কথাটুকু বলেই ঠাকুর আর দাঁড়ালেন না, তাড়াতাড়ি পা নামিয়ে পেছন ফিরে চলে গেলেন।
এতক্ষণ বিমলার চোখে জল ছিল না, কিন্তু ঠাকুরের ওই মুখ দেখে সে হু হু করে কেঁদে ফেলল। গাড়ি চলতে শুরু করল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সুরবালা দেবী (সুর-মা) দেখলেন, সেই নির্লিপ্ত, বৈরাগ্যবান সন্ন্যাসীর গাল বেয়ে টপটপ করে জল গড়াচ্ছে। তিনি দ্রুত পায়ে নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় বসে পড়লেন এবং কোঁচার খুঁটে চোখমুখ মুছলেন। একজন জগৎগুরুর এই যে এক সাধারণ গৃহস্থ পিতার মতো আকুলতা—এ কি শুধুই মায়া? না, এটি ছিল তাঁর সন্তানের প্রতি, ভক্তের প্রতি এক অকৃত্রিম নাড়ির টান।
২. অশ্বিনীবাবুর প্রয়াণ: “শিষ্য হতে আমার প্রিয় কে?”
অশ্বিনীবাবু (অশ্বিনীকুমার দাশগুপ্ত) ছিলেন ঠাকুরের একজন অত্যন্ত প্রিয় গৃহী শিষ্য। তিনি ছিলেন ডবল এম.এ. পাস, সাবজজ এবং অত্যন্ত বিত্তবান ও প্রতিপত্তিশালী মানুষ। কিন্তু ঠাকুরের কাছে তিনি ছিলেন একেবারে অনুগত দাসের মতো। ঠাকুর যখন তাঁর বাড়িতে যেতেন, তখন এই উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী নিজের হাতে ঠাকুরের শৌচাগার পরিষ্কার করতেন!
১৩৩৪ সালের বৈশাখ মাস। ঠাকুর তখন পুরীর নীলাচল কুটিরে। ২২শে বৈশাখ রাতে ছাদের ওপর ঠাকুরের বিছানা পাতা হয়েছে। গভীর রাতে হঠাৎ একটা চাপা কাশির শব্দে ঠাকুরের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে তাকাতেই তিনি দেখলেন, মশারির গা ঘেঁষে একটি ছায়া দাঁড়িয়ে আছে—অশ্বিনীবাবু! রোগশীর্ণ মুখে চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে, যেন কাকে খুঁজছেন। ঠাকুরের সাথে চোখাচোখি হতেই সেই দৃষ্টি শান্ত হয়ে এল এবং একটু পরেই ছায়ামূর্তিটি মিলিয়ে গেল।
পরদিন সকালেই টেলিগ্রাম এল—অশ্বিনীবাবু মারা গেছেন। রাতে ঠাকুর যা দেখেছিলেন, তা আসলে মৃত্যুকালে গুরুর প্রতি ভক্তের ব্যাকুল আত্মার অন্বেষণ।
কয়েকদিন পর অশ্বিনীবাবুর সদ্যবিধবা স্ত্রী তাঁর পিতৃহীন ছোট ছোট ছেলেদের নিয়ে পুরীতে ছুটে এলেন ঠাকুরের কাছে। শোকের ছায়ায় গোটা বাড়ি নিস্তব্ধ। দিদিমা (অশ্বিনীবাবুর স্ত্রী) ছেলেদের নিয়ে প্রণাম করতে এলেন। সবাই ভাবছে ঠাকুর হয়তো এখন তাঁদের শান্ত করবেন, সান্ত্বনা দেবেন। কিন্তু একি!
বিধবা স্ত্রী ও পিতৃহীন ছেলেদের দেখামাত্রই সেই যোগীরাজ ঠাকুর শিশুদের মতো ‘হাউ হাউ’ করে ডুকরে কেঁদে উঠলেন! তিনি দুই হাত বাড়িয়ে অশ্বিনীবাবুর ছেলেদের বুকে চেপে ধরলেন। তাঁর বিরাট দেহ থরথর করে কাঁপতে লাগল। নিজের শোক ভুলে দিদিমা উল্টে ঠাকুরকেই সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বললেন, “একি ঠাকুর! কোথায় তুমি আমাদের সান্ত্বনা দেবে, তা না নিজেই কেঁদে সারা হলে?”
তখন সজল চোখে, ভাঙা গলায় ঠাকুর যে কথাটি বলেছিলেন, তা আজও ভক্তদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। তিনি বলেছিলেন, “ভক্ত-শিষ্য হইতে আমার প্রিয় কে?” একজন গুরুর কাছে তাঁর ভক্তরা যে নিজের সন্তানের চেয়েও আপন, এই অশ্রুসজল ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
৩. ফণীবাবুর প্রতি অভিমান: ছাদের ওপর এক বালকের আনন্দ
হাওড়ার ফণীবাবু (ফণীভূষণ মিত্র) ছিলেন ঠাকুরের আরেকজন অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ভক্ত। ঠাকুর তাঁকে আর অশ্বিনীবাবুকে অনেকটা বন্ধুর মতোই দেখতেন। ফণীবাবুর সাথে ঠাকুরের সম্পর্কটা ছিল বড়ই অদ্ভুত—কখনও মান-অভিমান, কখনও বা অসীম নির্ভরতা।
একবার হাওড়ায় থাকার সময় ফণীবাবুর সাথে ঠাকুরের কী একটা বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য হলো। ফণীবাবু ছিলেন খুব জেদী মানুষ। তিনি রাগ করে পূজোর ছুটিতে ঠাকুরকে বাড়িতে রেখেই বাইরে বেড়াতে চলে গেলেন। ঠাকুর এতে মনে মনে ভীষণ কষ্ট পেলেন। তাঁর মনের এই বিষণ্ণতা বাড়ির সবাই বুঝতে পারছিল।
দশ-বারো দিন কেটে গেছে। ফণীবাবুর ছুটি শেষ হতে তখনও অনেক বাকি। একদিন সকালে দোতলার বারান্দায় একটা জলচৌকিতে বসে ঠাকুর দাঁত মাজছিলেন। তাঁর মুখখানা ভার, দৃষ্টি রাস্তার দিকে। হঠাৎ তিনি সোজা হয়ে বসে আনন্দে বলে উঠলেন, “ফণী না?”
মাটি থেকে মুখ তুলে সুর-মা বললেন, “কই ঠাকুর, কোথায় দেখলেন? বাবা তো আসেননি!” ঠাকুর আঙুল দিয়ে রাস্তার বাঁকটা দেখিয়ে বললেন, “ওই যে যাচ্ছে—বাজারের থলি হাতে ফণীই তো!” সবাই অবাক। কারণ ফণীবাবু আগের দিন রাতেই যে বাড়ি ফিরেছেন, তা কেউ জানতই না!
ঠাকুর তখন একেবারে ছোট শিশুর মতো একগাল হেসে উঠলেন এবং বললেন, “ফণী এসেছে—খোঁজ নিয়ে দেখ। আমি ওর হাঁটা চিনি—ভুল হয়নি আমার।”
সত্যিই দাদামশাই (ফণীবাবু) ফিরেছিলেন। ঠাকুরের এই আনন্দের কারণ কী ছিল? কারণ তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে ফণী হয়তো তাঁর ওপর রাগ করে দূরে চলে গেছে। কিন্তু যখন দেখলেন ভক্ত তাঁর কাছে ফিরে এসেছে, তখন এক পরম স্বস্তিতে তাঁর সমস্ত অভিমান গলে জল হয়ে গেল। বিকেলে যখন ফণীবাবু এলেন, তখন ঠাকুর এমনভাবে গল্প শুরু করলেন যেন কিছুই হয়নি। গুরুর এই যে ব্যাকুলতা আর ভালোবাসা, তা দেখে দাদামশাইয়ের চোখ জলে ভরে উঠেছিল। তিনি বলতেন, “ও কতবড় জ্ঞানী কি যোগী তা আমি বুঝি না, আমি ভালোবাসি মানুষটাকে। অমন প্রেমের মানুষ আর কোথাও দেখিনি।”
৪. মুমূর্ষু নরেশদাকে কৃপা: মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা
পাবনা জেলার স্থলের সুবিখ্যাত জমিদার বংশের ছেলে ছিলেন নরেন্দ্রচন্দ্র পাকড়াশী (নরেশদা)। সতেরো বছর বয়সে জিমন্যাস্টিক করতে গিয়ে তাঁর বুকে মারাত্মক আঘাত লাগে এবং হৃদ্যন্ত্র থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। বছরের পর বছর ভুগে তিনি একেবারে শয্যাশায়ী, অস্থিকঙ্কালসার হয়ে যান। চিকিৎসকরা তাঁর জীবনের সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।
এমন সময় নরেশদার মনে পড়ল স্বামী নিগমানন্দের কথা, যাঁকে তিনি একবার ঢাকায় দেখেছিলেন। জানতে পারলেন ঠাকুর আলিপুরদুয়ারে আছেন। বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতা যাঁর নেই, সেই মুমূর্ষু নরেশদা বালিশের তলা থেকে কিছু লুকানো টাকা নিয়ে, বাড়ির সবাইকে ফাঁকি দিয়ে এক শীতের সকালে বেরিয়ে পড়লেন।
হাড়কাঁপানো শীতে থার্ড ক্লাস ট্রেনে দুইবার ট্রেন বদল করে তিনি যখন আলিপুরদুয়ারে এসে পৌঁছলেন, তাঁর চেহারা দেখে সবাই শিউরে উঠল। মনে হলো এই বুঝি তাঁর প্রাণপাখি বেরিয়ে যাবে। ঠাকুরের আদেশে তাঁকে প্রসাদ দেওয়া হলো। ফলের রস ছাড়া যাঁর কিছুই হজম হতো না, তিনি সেদিন ঠাকুরের আশীর্বাদে নির্দ্বিধায় খিচুড়ি, পিঠা, পায়েস সব খেয়ে ফেললেন এবং আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর কিছুই হলো না!
পরদিন ঠাকুর তাঁকে দীক্ষা দিলেন। দীক্ষার পর ঠাকুর তাঁকে নির্দেশ দিলেন প্রণাম করতে। কিন্তু নরেশদার পেটের পিলে এত বড় হয়ে গিয়েছিল যে তাঁর পক্ষে মাটিতে মাথা ঠেকানো সম্ভব ছিল না। তখন ঠাকুর নিজে আসনে বসে নরেশদার মাথাটি টেনে আনলেন এবং নিজের বাঁ উরুর ওপর রাখা ডান পায়ের তলা দিয়ে তাঁর কপালখানা জোরে ঘষে দিলেন!
সেই মুহূর্তে নরেশদা অনুভব করলেন, তাঁর সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। আর সেই সাথে কানে এল এক গভীর অভয়বাণী—“যাও, নিশ্চিন্তে সংসার করগে। সব ভার আমার ওপর রইল।”
আলিপুরদুয়ার থেকে যখন নরেশদা বাড়ি ফিরলেন, তখন কেউ তাঁকে চিনতে পারল না। সেই অস্থিকঙ্কালসার মানুষটির দেহে তখন স্বাস্থ্যের জোয়ার। গুরুর কৃপায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে নরেশদা আজীবন তাঁর ঠাকুরের চরণে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন।
৫. দার্জিলিংয়ের বুকে ব্যথা: ভক্তের জন্য জগন্মাতার দর্শন ত্যাগ
১৩৩৬ সালের কথা। বস্তারের রাজা প্রফুল্লচন্দ্র ভঞ্জদেওয়ের একান্ত অনুরোধে ঠাকুর দার্জিলিংয়ে গেছেন। হঠাৎ সেখানে তাঁর বুকে এক নিদারুণ ব্যথা শুরু হলো। এই ব্যথা এতই তীব্র ছিল যে, ঠাকুর মাঝে মাঝেই যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন। বিখ্যাত ডাক্তার বিধান রায় এসেও এই ব্যথার কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না।
টানা তিন-চার দিন এই অসহ্য যন্ত্রণা চলার পর একদিন রাতে ব্যথাটা হঠাৎ কমে গেল। পরদিন ভোরে মায়েরা যখন ঠাকুরের ঘরে ঢুকলেন, দেখলেন ঠাকুর বিছানায় বসে আছেন। তাঁর দু’চোখ বেয়ে জলের ধারা নামছে—তিনি ডুকরে কাঁদছেন।
মা জিজ্ঞেস করলেন, “বড্ড কষ্ট হচ্ছে ঠাকুর? কাঁদছেন কেন?” ঠাকুর ধরা গলায় বললেন, “ব্যথা ভালো হয়ে গেছে আমার।” “তবে কাঁদছেন কেন ঠাকুর?”
তখন ঠাকুর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললেন, “আমার সর্বস্বের বিনিময়ে সে-ব্যথা ভালো করে দিয়ে গেছে রাণী (জগন্মাতা)। এর চেয়ে আমার বুকের ব্যথা থাকাই যে ঢের ভালো ছিল রে—”
ঠাকুর জানালেন, গত রাতে যখন যন্ত্রণায় তিনি প্রায় অজ্ঞান, তখন দেখলেন স্বয়ং মা জগদীশ্বরী তাঁর পাশে বসে বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। মা তাঁকে বললেন, “কার জন্য কেঁদে মর তুমি? জগতের কেউ তোমার নয়। তুমি মিথ্যে মায়ায় কেন এত আত্মবিস্মৃত? যাও, তোমার ব্যথা সেরে গেল।” কিন্তু যাওয়ার আগে জগন্মাতা একটি শর্ত দিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, “যতদিন ওদের (শিষ্য-ভক্তদের) না ভুলতে পারছ, আমার দেখা তুমি আর পাবে না!”
ঠাকুর সেদিন বাচ্চাদের মতো কেঁদেছিলেন কারণ ভক্তদের ভালোবাসতে গিয়ে তিনি তাঁর ইষ্টদেবীর দর্শন চিরকালের মতো হারিয়ে ফেললেন। জগন্মাতা তাঁর কাছ থেকে আনন্দ কেড়ে নিলেন, তবু তিনি তাঁর ভক্তদের ছাড়তে পারলেন না। এর পরের ছয় বছর তিনি বেঁচে ছিলেন, কিন্তু তাঁর সেই আগের আনন্দ আর ছিল না। ভক্তদের প্রতি এতবড় আত্মত্যাগ আর কোনো মহাপুরুষের জীবনে সচরাচর দেখা যায় না।
উপসংহার
স্বামী নিগমানন্দ পরমহংসদেব কেবল তত্ত্বজ্ঞানের শুকনো সাগরেই বিচরণ করেননি, তিনি তাঁর ভক্তদের ভালোবেসেছিলেন এক পরমাত্মীয়ের মতো। শাসন, অভিমান, স্নেহ আর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ভগবান যখন গুরুরূপে পৃথিবীতে আসেন, তখন তিনি তাঁর আশ্রিত সন্তানদের জন্য নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না।
আশা করি, নারায়ণী দেবীর লেখা ‘নীলাচলে ঠাকুর’ গ্রন্থ থেকে তুলে আনা এই পাঁচটি গল্প আপনাদের হৃদয়কে এক অনাবিল শান্তিতে ভরিয়ে তুলেছে। ঠাকুরের এই অসীম প্রেমের বাণী আমাদের জীবনেও প্রতিফলিত হোক—এই কামনায় আজকের মতো এখানেই বিদায় নিচ্ছি।

Responses
Hi, this is a comment.
To get started with moderating, editing, and deleting comments, please visit the Comments screen in the dashboard.
Commenter avatars come from Gravatar.