শ্রীশ্রী নিগমানন্দ পরমহংসদেব — এই নামটির সঙ্গে পরিচয় আছে এমন যে কেউ জানেন, তিনি কেবল একজন সাধু ছিলেন না, ছিলেন একটি সম্পূর্ণ জীবনদর্শনের প্রবক্তা। সনাতন ধর্মের প্রচার, সৎশিক্ষার প্রসার এবং নিঃস্বার্থ সেবা — এই তিনটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আসাম-বঙ্গীয় সারস্বত মঠ। আজ সেই মঠের প্রায় পঞ্চাশটি শাখা সারা ভারত এবং বিদেশে আধ্যাত্মিক আলো ছড়িয়ে চলেছে।
এই ব্লগে আমরা জানব সেই মঠের জন্মকাহিনি, তার উদ্দেশ্য ও দর্শন, ভারত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শাখা আশ্রমগুলির পরিচয়, বার্ষিক উৎসবের বিবরণ — এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তরও: আপনি কীভাবে এই আধ্যাত্মিক প্রবাহের অংশ হতে পারেন?
শ্রীশ্রী নিগমানন্দ পরমহংসদেব — সংক্ষিপ্ত জীবন ও সাধনার কথা
১৮৭৯ সালে নদিয়া জেলার কুটবপুরে (বর্তমান বাংলাদেশ) এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেন নলিনীকান্ত ভট্টাচার্য। পিতা ভুবন মোহন ভট্টাচার্য ও মাতা যোগেন্দ্রমোহিনীর এই পুত্র ছোট থেকেই অসাধারণ মেধা, নির্ভীকতা ও নেতৃত্বগুণের অধিকারী ছিলেন।
শৈশবেই মা মারা যান। মৃত্যুর আগে মা তাঁকে জগৎমাতার চরণে সমর্পণ করে যান। শোকার্ত নলিনীকান্ত সেই কথা আক্ষরিক অর্থেই নিলেন — কিন্তু জগৎমাতার দেখা না পেয়ে তিনি হয়ে উঠলেন ঘোর নাস্তিক। সাধু-সন্ন্যাসীদের কথায় তাঁর অবজ্ঞা ছিল, ধর্মকে মনে করতেন অন্ধ বিশ্বাসের খেলা।
সতেরো বছর বয়সে বিবাহ হল সুধাংশুবালা দেবীর সঙ্গে। কিন্তু সেই সুখও বেশিদিন স্থায়ী হল না — স্ত্রীর অকালমৃত্যু তাঁকে নতুন করে টেনে নিল জীবন-মৃত্যুর রহস্যের দিকে। থিওসফিক্যাল সোসাইটিতে গেলেন চেন্নাইতে, কিন্তু সন্তুষ্ট হলেন না। শেষে বীরভূমের তারাপীঠে মহাতান্ত্রিক বামাক্ষ্যাপার কাছে তন্ত্রসাধনায় প্রথম আলো দেখলেন।
কিন্তু তাঁর অনুসন্ধান সেখানেই থামেনি। রাজস্থানের পুষ্করে গুরু শ্রীমৎ স্বামী সচ্চিদানন্দ সরস্বতীর কাছে বেদান্তের দীক্ষা নিলেন এবং নামও পরিবর্তন হল — নলিনীকান্ত হলেন নিগমানন্দ। এরপর উত্তর-পূর্ব ভারতের গভীর অরণ্যে যোগরাজ সুমেরু দাশজির কাছে যোগসাধনায় পৌঁছালেন নির্বিকল্প সমাধিতে। এবং প্রেম ও ভক্তির পথে দীক্ষা দিলেন গৌরী মা নামের এক বিরল আধ্যাত্মিক সাধিকা।
তন্ত্র, জ্ঞান, যোগ ও প্রেম — সনাতন ধর্মের চারটি মূল পথেই পূর্ণসিদ্ধি লাভ করেছিলেন তিনি, যা মানব ইতিহাসে বিরল। ১৯০৭ সালের প্রয়াগের কুম্ভমেলায় শৃঙ্গেরী মঠের তৎকালীন শঙ্করাচার্যের উপস্থিতিতে তাঁকে পরমহংস উপাধি প্রদান করা হয়।
১৯৩৫ সালের ২৯শে নভেম্বর কলকাতায় তিনি যোগক্রিয়ার মাধ্যমে মহাসমাধিতে প্রবেশ করেন। তাঁর ভক্তরা আজও বিশ্বাস করেন — সদ্গুরু অমর, তাঁর উপস্থিতি অনুভব করা যায় আশ্রমের প্রতিটি কোণে।
শান্তি আশ্রম থেকে আসাম-বঙ্গীয় সারস্বত মঠ: প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
প্রথম সূচনা — দুর্গাপুর, কুমিল্লা
সাধনায় সিদ্ধিলাভের পর শ্রীশ্রীঠাকুর অনুভব করলেন, একা রাখলে হবে না — সমাজের কাছে, মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে এই আধ্যাত্মিক সম্পদ। সেই লক্ষ্যে বাংলা ১৩১৪ সালে কুমিল্লার দুর্গাপুরে অক্ষয় তৃতীয়ার শুভতিথিতে প্রথমবারের মতো শান্তি আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই মঠের বীজপত্তন।
সাড়ে তিন বছর সেখানে থাকার পর নানা কারণে ঢাকায় ফিরে গেলেন তিনি। ১৩১৮ বঙ্গাব্দে ঢাকার জেন্ডেরিয়ায় স্থানান্তরিত হল শান্তি আশ্রম। সেখানে সেই বছরেরই ২৬শে অগ্রহায়ণ প্রতিষ্ঠিত হল শ্রী গৌরাঙ্গ অনাথ নিকেতন — যার উদ্দেশ্য ছিল অসহায়, রুগ্ণ ও দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষদের সেবা করা। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি মানবসেবা ছিল তাঁর মঠ-প্রকল্পের অপরিহার্য অঙ্গ।
কোকিলামুখে স্থায়ী প্রতিষ্ঠা
জোরহাটের কাছে চারিগাঁওয়ের ভক্ত সরুরাম কলিতা একদিন সংবাদ নিয়ে এলেন — আসামে সরকার অল্প মূল্যে জমি দিচ্ছে। ঠাকুরের টাকায় কোকিলামুখের কুমারভেটি চাপড়ি গ্রামে ৮০ বিঘা জমি কিনে নেওয়া হল।
১৩১৮ বঙ্গাব্দের ১০ই মাঘ শ্রীশ্রীঠাকুর স্বামী স্বরূপানন্দ ও অতুল চক্রবর্তীকে নিয়ে ঢাকা থেকে কোকিলামুখে এলেন, পরিদর্শন করলেন জায়গাটি। সেই বছরেই ২২শে ফাল্গুন ঢাকার আশ্রম গুটিয়ে সবাই কোকিলামুখে এসে গেলেন। আর ১৩১৯ বঙ্গাব্দের ৭ই বৈশাখ, অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্যতিথিতে, কোকিলামুখে প্রতিষ্ঠিত হল গুরুব্রহ্মের আসন — এবং আশ্রমের নাম রাখা হল আবারও শান্তি আশ্রম।
সারস্বত মঠের নামকরণ ও প্রথম সাত শিষ্য
এই পর্যায়ে শ্রীশ্রীঠাকুর প্রথম সাতজন ত্যাগী শিষ্যকে সন্ন্যাসে দীক্ষিত করলেন। তাঁরা হলেন স্বামী চিদানন্দ, স্বামী প্রেমানন্দ, স্বামী স্বরূপানন্দ, স্বামী যোগানন্দ, স্বামী শুদ্ধানন্দ, স্বামী বোধানন্দ এবং স্বামী শারদানন্দ। শৃঙ্গেরী মঠের পরম্পরায় 'সরস্বতী' উপাধিধারী হওয়ায় তিনি তাঁর মঠের নাম রাখলেন সারস্বত মঠ, আশ্রমের নাম সারস্বত আশ্রম এবং সংঘের নাম সারস্বত সংঘ। তাঁর রচিত ধর্মগ্রন্থগুলি পরিচিত হল সারস্বত গ্রন্থাবলী নামে।
১৩২৫ বঙ্গাব্দ থেকে এই মঠের পূর্ণ নাম হল আসাম-বঙ্গীয় সারস্বত মঠ — ইংরেজিতে যা ১৯১২ সালের প্রতিষ্ঠাকাল বহন করে।
মঠ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও দার্শনিক ভিত্তি
আসাম-বঙ্গীয় সারস্বত মঠ কোনো গোষ্ঠীবদ্ধ সম্প্রদায়ের মঠ নয় — এটি একটি সার্বজনীন আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠান। মঠ প্রতিষ্ঠার পেছনে শ্রীশ্রীঠাকুরের তিনটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল:
প্রথমত, সনাতন ধর্মের প্রচার ও প্রসার। দ্বিতীয়ত, সৎশিক্ষার বিস্তার — অর্থাৎ এমন শিক্ষা যা মানুষের সামগ্রিক ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়তা করে এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ প্রশস্ত করে। তৃতীয়ত, সমস্ত প্রাণীর সেবা — কারণ তাঁর মতে, যে মানুষ আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন, তিনিই মানবজাতির সেবা করার প্রকৃত অধিকারী।
তাঁর বিখ্যাত আদর্শবাণী ছিল: "শঙ্করের মত, গৌরাঙ্গের পথ।" অষ্টম শতাব্দীর আদি শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত বেদান্ত দর্শন অনুসারে জীব ও ব্রহ্ম এক — এই সত্য উপলব্ধি করাই মানবজীবনের পরম লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ হল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তিপথ। জ্ঞান ও ভক্তির এই অপূর্ব সমন্বয়ই ছিল তাঁর জীবনদর্শনের মূল কথা।
তাঁর মতে সেবাব্রতই মানবধর্ম। পরিবারের ভেতর থেকে শুরু করে ক্রমে সমাজ, দেশ এবং সমগ্র মানবজাতির প্রতি সেবার মনোভাব গড়ে তুললে — মানুষ নিজেকে ব্রহ্মে প্রসারিত করতে পারেন। এই দর্শনকে তিনি বলতেন "অহংত্বের প্রসার"। ভক্তরা এই পথে গৃহে থেকেও আধ্যাত্মিক জীবন যাপন করতে পারেন।
সারা দেশে আশ্রমের বিস্তার
প্রধান মঠ ছাড়াও শ্রীশ্রীঠাকুর তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার পাঁচটি বিভাগে পাঁচটি মূল আশ্রম স্থাপন করেছিলেন। প্রতিটি আশ্রমের পেছনে রয়েছে স্থানীয় ভক্তদের অসাধারণ উৎসর্গের ইতিহাস।
মূল পাঁচটি বিভাগীয় আশ্রম
- শ্রীশ্রী গুরুধাম, কুটবপুর (বাংলাদেশ): ঠাকুরের জন্মভিটা মেহেরপুর জেলার কুটবপুরে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ৩রা কার্তিক শাস্ত্রীয় বিধিতে 'গুরুধাম' প্রতিষ্ঠিত হয়। পিতৃভূমিতে মন্দির গড়ার ইচ্ছায় স্থানীয় ভক্তদের সহায়তায় ঠাকুর নিজে সেই প্রতিষ্ঠাকার্য সম্পন্ন করেন।
- পূর্ববাংলা সারস্বত আশ্রম, দ্বজনগর, ত্রিপুরা: মূলত কুমিল্লার ময়নামতিতে ১৩২৫ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। ১৩২৭ বঙ্গাব্দে কুমারানন্দ মহারাজের আগমনে এটি পূর্ণরূপ পায়। দেশভাগের পর ত্রিপুরার বিশালগড়ের নিকট দ্বজনগরে স্থানান্তরিত হয়।
- পশ্চিমবাংলা সারস্বত আশ্রম, খারকুশমা, পশ্চিম মেদিনীপুর: চন্দ্রিচরণ পাল ও পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রভাকর চৌধুরীর উদ্যোগে তৈরি এই আশ্রমে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ১১ই পৌষ ঠাকুরের উপস্থিতিতে জগদ্গুরুর আসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
- উত্তরবাংলা সারস্বত আশ্রম, বগুড়া (বাংলাদেশ): বগুড়া শহরের কার্তোয়া নদীর পূর্বতীরে ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ২৬শে শ্রাবণ ঝুলন পূর্ণিমায় ঠাকুর নিজে এখানে গুরুব্রহ্মের আসন স্থাপন করেন। প্রথমে নাম ছিল 'শ্রীশ্রী গৌরাঙ্গ সেবাশ্রম'।
- দক্ষিণবাংলা সারস্বত আশ্রম, হালিশহর (উত্তর ২৪ পরগনা): বালিয়াটির গঙ্গা গোপাল সাহার (পরে গোপাল চৈতন্য দেব পীযূষপাণি) ভক্তি ও দানের মাধ্যমে ১৩৩২ বঙ্গাব্দের গোড়ায় এই আশ্রমের কাজ শুরু হয় এবং অক্ষয় তৃতীয়ায় গুরুব্রহ্মের আসন স্থাপিত হয়। এই আশ্রমে ঠাকুরের সমাধি রয়েছে — তাই এটি ভক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান।
- মধ্যবাংলা সারস্বত আশ্রম, পূর্বস্থলী, বর্ধমান: ১৩২৩ বঙ্গাব্দে ঢাকার জারিয়াতুলীতে প্রথম প্রতিষ্ঠিত এবং পরে জয়দেবপুরের কাছে কলনি গ্রামে স্থানান্তরিত এই আশ্রম দেশভাগের পর স্বামী প্রেমানন্দ সরস্বতী মহারাজের উদ্যোগে ১৩৫৭ বঙ্গাব্দে নবদ্বীপের নিকট পূর্বস্থলীতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য শাখাগুলি
এই পাঁচটি মূল বিভাগীয় আশ্রম ছাড়াও সারা দেশে ও বিদেশে আরও অনেক শাখা আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জলপাইগুড়ির ডাঙাপাড়ায় ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ১৮ই বৈশাখ ঠাকুর নিজে গুরুব্রহ্মের আসন স্থাপন করেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের আনন্দনগরে বুদ্ধপূর্ণিমায়, ঝাড়খণ্ডের মানুসমুড়িয়ায়, পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে ঝুলন পূর্ণিমায়, পুরুলিয়ার আদ্রায়, হুগলির মধ্যাঙ্গা-রাজহাটীতেও আশ্রম রয়েছে। ওড়িশার ভুবনেশ্বর, কটক ও পুরীতে আশ্রম কার্যরত। আসামের গর্মুরে এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, রংপুর, মাগুরা ও বরিশালেও শাখা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশটি শাখা আশ্রম দেশে ও বিদেশে সক্রিয়।
মঠের প্রকাশনা ও প্রচার বিভাগ
আসাম-বঙ্গীয় সারস্বত মঠের প্রকাশনা বিভাগ — যা প্রচার বিভাগ নামে পরিচিত — স্বামী নিগমানন্দের রচিত গ্রন্থগুলি প্রকাশ ও বিতরণের কাজ সামলায়। ঠাকুর মোট পাঁচটি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেছেন — ব্রহ্মচর্য সাধন, যোগীগুরু, তান্ত্রিকগুরু, জ্ঞানীগুরু এবং প্রেমিকগুরু। এই পাঁচটি গ্রন্থ একসাথে 'সারস্বত গ্রন্থাবলী' নামে পরিচিত। আধ্যাত্মিক সাধনার পথে এগুলি আজও অমূল্য পাথেয়।
প্রচার বিভাগের যাত্রা শুরু কুমিল্লায়, তারপর ঢাকা, কোকিলামুখ, বগুড়া, হালিশহর হয়ে কলকাতায় — এবং অবশেষে ১৯৯৭ সালের নভেম্বরে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটিতে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখান থেকেই এখন সমস্ত প্রকাশনা পরিচালিত হয়।
আর্যদর্পণ পত্রিকার কথাও আলাদা করে বলতে হয়। ঠাকুর নিগমানন্দের সম্পাদনায় প্রকাশিত এই মাসিক পত্রিকাটি ছিল হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির মুখপত্র — ভারতের প্রথম দিকের পত্রিকাগুলির একটি। ধর্মীয় সংস্কার ও আধ্যাত্মিক দিগন্ত উন্মোচনে এটি সমসাময়িক সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। আজও মঠের পক্ষ থেকে আর্যদর্পণের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হচ্ছে।
সার্বভৌম ভক্তসম্মিলনী — মঠের বার্ষিক প্রাণোৎসব
স্বামী নিগমানন্দের সবচেয়ে অভিনব ও কার্যকর উদ্ভাবনগুলির একটি হল সার্বভৌম ভক্তসম্মিলনী। গ্রন্থ লেখা, পত্রিকা প্রকাশ, আশ্রম স্থাপন — সবকিছুর পরেও মনে হচ্ছিল কিছু একটা অসম্পূর্ণ। কাশীধামের গম্ভীরায় থাকার সময় ভেতর থেকে তাগিদ অনুভব করলেন — ভক্তদের একসাথে মিলিত করাটাই আসল কাজ। তিনি শিষ্যদের চিঠি লিখলেন:
সেই থেকে প্রতি বছর পৌষ মাসে বিভিন্ন আশ্রমে পালাক্রমে অনুষ্ঠিত হয় এই মহাসম্মেলন। গৃহী ভক্ত ও সন্ন্যাসীদের এই মিলনের তিনটি মূল উদ্দেশ্য:
- আদর্শ গার্হস্থ্য জীবন গঠন — সংসারের মধ্যে থেকেও কীভাবে ধর্মমতে জীবন যাপন করা যায়
- সংঘশক্তির প্রতিষ্ঠা — একসাথে থেকে পরস্পরকে শক্তিশালী করা
- পারস্পরিক ভাববিনিময় — আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া
১০৯তম সার্বভৌম ভক্তসম্মিলনী ২০২৩ সালের ২৭ থেকে ৩০ ডিসেম্বর হুগলি জেলার রাজহাটী বন্দরে সগৌরবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, দিল্লি, মহারাষ্ট্র সহ বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার ভক্ত এই মহামিলনে অংশ নেন।
মঠে পালিত উৎসব ও আধ্যাত্মিক কার্যক্রম
মঠ ও এর শাখা আশ্রমগুলিতে সারা বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠান পালিত হয়। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
মহাসমাধি উৎসব: প্রতি বছর ঠাকুরের মহাসমাধি দিবস যথাবিহিত ভক্তিপূর্ণ পরিবেশে পালিত হয়। হালিশহর মঠে ১৬ই ডিসেম্বর এই উৎসব বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ঠাকুরের সমাধিস্থল এই আশ্রমেই। সেদিন দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন প্রিয় ঠাকুরের চরণে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করতে।
গীতা জয়ন্তী: মোক্ষদা একাদশী তিথিতে গীতাজয়ন্তী পালিত হয়। হালিশহর মঠের নিগমানন্দ যোগ শিক্ষাকেন্দ্র, নিগমানন্দ সংস্কৃত সংঘ ও গীতাপাঠ চক্রের উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানে গীতাপাঠ, ধ্যান ও সঙ্গীত পরিবেশিত হয়। ভক্তদের গীতাগ্রন্থ প্রদান করা হয়।
ঝুলন পূর্ণিমা: এই পবিত্র তিথিতে আশ্রমে বিশেষ পূজা ও উৎসব হয়। বেশ কয়েকটি আশ্রমের প্রতিষ্ঠাদিন এই তিথিতে হওয়ায় এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
গৌর পূর্ণিমা: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথি বিশেষ ভক্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়। কারণ "গৌরাঙ্গের পথ" ছিল ঠাকুরের দর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অক্ষয় তৃতীয়া: মঠের প্রতিষ্ঠাদিন হিসেবে এই তিথি বিশেষ স্মরণীয়। বহু আশ্রমের গুরুব্রহ্মের আসনও এই তিথিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
যোগ শিক্ষা কেন্দ্র: হালিশহর মঠে নিগমানন্দ যোগ শিক্ষাকেন্দ্র নিয়মিত যোগাসন ও প্রাণায়ামের ক্লাস পরিচালনা করে। নিগমানন্দ সংস্কৃত সংঘ মারফত সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার সুযোগও রয়েছে।
হালিশহর মঠ — দক্ষিণবঙ্গের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র
হালিশহরের দক্ষিণবাংলা সারস্বত আশ্রম এই মঠপরিবারের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ শাখা। পবিত্র গঙ্গার তীরে অবস্থিত এই আশ্রম ভক্তদের কাছে অত্যন্ত আদরের, কারণ এখানেই রয়েছে পরমপূজ্য শ্রীশ্রীঠাকুরের পুত্তনুর সমাধিস্থল।
বর্তমানে এই মঠের মোহান্ত হলেন শ্রীমৎ ডঃ স্বামী ব্রজেশানন্দ সরস্বতী মহারাজ এবং ট্রাস্টবোর্ড সম্পাদক হলেন স্বামী বিমলানন্দ সরস্বতী মহারাজ। তাঁদের পরিচালনায় মঠের সমস্ত কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
মঠে নিগমানন্দ যোগ শিক্ষাকেন্দ্র, নিগমানন্দ সংস্কৃত সংঘ ও গীতাপাঠ চক্র নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করে। ধর্মপ্রাণ মানুষদের জন্য এই মঠে নিয়মিত সৎসঙ্গ, পাঠচক্র ও ধর্মীয় আলোচনার আয়োজন থাকে।
মঠের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করবেন ও যুক্ত হবেন
মঠের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চাইলে, বই সংগ্রহ করতে চাইলে, আর্থিক সহায়তা করতে চাইলে অথবা শুধু আরও জানতে চাইলে — নিচের তথ্যগুলি কাজে আসবে।
প্রধান মঠ (কোকিলামুখ, আসাম):
আসাম-বঙ্গীয় সারস্বত মঠ
পো: কোকিলামুখ, জেলা: জোরহাট, আসাম — ৭৮৫১০৮
ফোন: ০৯৪৩৫-০৫৩-১৩৪
সময়: সকাল ৯টা — বিকেল ৬টা
প্রচার বিভাগ (পানিহাটি, কলকাতা):
রাজা রামচন্দ্র ঘাট রোড, পো: পানিহাটি, কলকাতা — ৭০০১১৪
ফোন: (০৩৩) ২৫৬৩-৫৪৮৬ / ০৭০০৩ ০৪১ ০৩০
ইমেইল: saraswatmath@gmail.com
সময়: সকাল ৯টা — দুপুর ১২টা এবং বিকেল ২টা — ৫টা
হালিশহর শাখা মঠ:
দক্ষিণবাংলা সারস্বত আশ্রম, হালিশহর, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ
অনলাইন দান: SBI Collect-এর মাধ্যমে অনলাইনে মঠের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবেন।
ওয়েবসাইট:
মূল মঠ: http://absmath.org
হালিশহর মঠ: https://www.absmhalisahar.in
শেষ কথা
স্বামী নিগমানন্দের প্রতিষ্ঠিত এই মঠ নিছক একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি জীবনযাপনের পদ্ধতি, একটি আধ্যাত্মিক পরিবার। যেখানে সন্ন্যাসী আর গৃহী একসাথে সাধনার পথে হাঁটেন, যেখানে জ্ঞান ও ভক্তির মেলবন্ধন ঘটে, যেখানে সেবাই হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ পূজা।
শতাধিক বছর ধরে সার্বভৌম ভক্তসম্মিলনীর ধারা বহমান। প্রতিটি আশ্রমের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয় সেই বাণী — "শঙ্করের মত, গৌরাঙ্গের পথ।" গঙ্গার তীরে হালিশহরে, আসামের কোকিলামুখে, ওড়িশার পুরীতে — সর্বত্র একই আলো, একই সুর।
আপনি যদি এই পথে কিছুটা হাঁটতে চান — কোনো উৎসবে অংশ নিন, ঠাকুরের গ্রন্থ পড়ুন, অথবা একবার আশ্রমে যান। অনেক সময় একটা জায়গায় পা রাখলেই বুঝতে পারা যায়, কিছু একটা সেখানে আছে — যা শুধু অনুভব করার জিনিস, বোঝানোর নয়।

Responses