আচার্যপরম্পরায় শঙ্কর ও তাঁহার দর্শন – স্বামী অমলানন্দ সরস্বতী – ১৩৯৫ আর্য্যদর্পণ থেকে পুণঃপ্রকাশিত

shankar-darshan-blog-hero-image

পুণঃপ্রকাশ সম্পর্কিত তথ্য

এই নিবন্ধটি ১৩৯৫ সালের আর্য্যদর্পণে প্রকাশিত হয়েছিলো। রচয়িতা শ্রদ্ধেয় স্বামী অমলানন্দ সরস্বতী। প্রায় ৩৭ বছর আগে শঙ্করাচার্য দ্বাদশ জন্মশতবার্ষিকী পূর্ত্তি সংখ্যায় (বৈশাখ ১৩৯৫) এই নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিলো। আমরা শ্রীঠাকুরের ভক্তদের জন্য শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাটি অপরিবর্তিতভাবে পুণঃপ্রকাশ করলাম। আর্য্যদর্পণের পুরোনো সংখ্যা শ্রদ্ধেয়া তৃপ্তিময়ি ঘোষের সৌজন্যে সংগৃহীত ও সযত্নে রক্ষিত। তাঁর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাই।

আচার্যপরম্পরায় শঙ্কর ও তাঁহার দর্শন

স্বামী অমলানন্দ সরস্বতী

অদ্বৈতবাদী আচার্যবর্গের যে গুরু-পরম্পরা ধারা তা আমরা নারায়ণ হতে আরম্ভ করে শঙ্কর এবং শঙ্করশিষ্যদের পর্যন্ত ধরে থাকি, তা কিন্তু সব ক্ষেত্রে গুরুশিষ্যপরম্পরা নহে, তা গুরু-পরম্পরা। এ বিষয়ে মহামহোপাধ্যায় ডঃ গোপীনাথ কবিরাজ এম. এ, ডি-লিট পদ্মবিভূষণ মহোদয় তাঁর গবেষণা- মূলক “ভারতীয় সাধনার ধারা গ্রন্থে (শ্রীবিদ্যার্ণব রচিত গ্রন্থ- অনুসারে) শঙ্কর সম্প্রদায়ের বিবরণ দিতে গিয়ে লিখছেন- ‘এই গ্রন্থানুসারে শঙ্করাচার্য গৌড়পাদের প্রশিষ্য নহেন। গৌড়পাদ হইতে শঙ্কর পর্যন্ত সাত পুরুষের নাম প্রাপ্ত হওয়া যায়। উহা ক্রমশ এই প্রকার – গৌড়পাদ, পাবক, পরাচার্য, সত্যনিধি, রামচন্দ্র, গোবিন্দ ও শঙ্করাচার্য। ইহা হইতে প্রতীত হয় যে শঙ্কর নিঃসন্দেহে গোবিন্দ-শিষ্য হলেও গৌড়পাদের প্রশিষ্য নহেন। প্রচলিত গ্রন্থে গৌড়পাদ ব্যাসশিষ্য শুকদেবের সাক্ষাৎ-শিষ্য বলিয়া পরিচিত। কিন্তু শুকদেব এবং গৌড়পাদের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানহেতু ঐতিহাসিকরা শুকের সহিত গৌড়পাদের সাক্ষাৎ গুরুশিষ্য- সম্বন্ধ স্বীকার করিতে সঙ্কোচ বোধ করেন। অনেকে মনে করেন শুকদেবের পর অদ্বৈতজ্ঞানের ধারা একপ্রকার উচ্ছিন্ন হইয়া গিয়াছিল। গৌড়পাদ সম্ভবতঃ অলৌকিক উপায়ে আবির্ভূত শুকদেবের দিব্যমূর্তির নিকট হইতে এই জ্ঞান প্রাপ্ত হইয়া ইহার পুনরুদ্ধার করেন। এই প্রকারে শুকের সঙ্গে তাঁহার গুরুশিষ্যসম্বন্ধ স্থির হয়। কিন্তু সাধারণ ঐতিহাসিকগণ ইহাকে প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করিতে পারেন না। ঐ গ্রন্থে গৌড়পাদের পূর্ববর্তী গুরুদের নামাবলীও প্রদত্ত হইয়াছে, যাহা পর্যালোচনা করিলে গৌড় এবং শুকের মধ্যে অনেক পুরুষের ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। এই পারম্পর্য হতেই বুঝা যায় অদ্বৈতবাদের গুরুধারার মধ্যে সবসময় গুরুশিষ্যধারা রক্ষিত হয় নাই বলে ইহাকে গুরুপরম্পরা ধারা বলা হয়, ইহা গুরুশিষ্যপরম্পরাধারা নহে। যদিও কোন কোন স্থানে গুরুশিষ্যধারা রক্ষিত হয়েছে – সর্বক্ষেত্রে নয়।

গোবিন্দপাদের পর শঙ্করাচার্যের আবির্ভাবে এক নতুন অধ্যাত্মযুগের সূচনা হয়। অধ্যাত্মজগতে আচার্য শঙ্কর এক বিস্ময়পুরুষ। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা, বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা, বোধের স্বচ্ছতা, প্রাণের উদারতা, কর্ম্মের ক্ষমতা সমস্তই অসাধারণ, অলৌকিক। এই অসাধারণ অধ্যাত্মপুরুষটির মাত্র ১৪ জন শিষ্য ছিলেন। তার মধ্যে পাঁচ জন সন্ন্যাসী ও নয় জন গৃহস্থ। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে পদ্মপাদাচার্য এবং সুরেশ্বরাচার্য ছিলেন অসাধারণ। তাঁদের রচিত গ্রন্থ হতেই প্রমাণ পাওয়া যায়। সুরেশ্বরাচার্য নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি, তৈত্তিরীয়োপনিষদ্ভাষ্যবার্তিকা, বৃহদারণ্যকভাষ্যবার্তিকা, ব্রহ্মসিদ্ধি, স্বারাজ্যসিদ্ধি নামে অদ্বৈত-বেদান্তের প্রকরণগ্রন্থ প্রণয়ন করেন। সুরেশ্বরাচার্য নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি গ্রন্থে তিন প্রকারের সমুচ্চয়বাদের খণ্ডন করেন। এই গ্রন্থের প্রথমেই বলা হয়েছে জীবজগতে সকলেরই দুঃখ আছে, দুঃখনিবৃত্তির আকাঙ্ক্ষাও আছে। ধর্মাধর্ম দেহের কারণ। ধর্মাধর্ম্মের নিবৃত্তি নাই। ইহাই কর্মবাদ এবং ইহা অধ্যাসের ফল। এই অধ্যাস আত্মবোধ দ্বারা নিবৃত্তি করা যায়। বেদান্তজ্ঞানেই সেই আত্মবোধ হওয়া সম্ভব, অন্য কিছুর দ্বারা নহে। এবং মোক্ষের হেতু ব্রহ্মাত্মৈক্যজ্ঞান। ব্রহ্মাত্মৈক্যজ্ঞান না থাকাই অজ্ঞান। আচার্য সুরেশ্বর শঙ্করদর্শনালম্বী। পরবর্তী আচার্যগণ যেমন চিৎ- সুখাচার্য, বিদ্যারণ্য, অমলানন্দ, অপ্পয়দীক্ষিত প্রভৃতি সুরেশ্বরের মত উদ্ধৃত করেছেন তাঁদের লেখনীতে। শঙ্করের অদ্বৈতজ্ঞানকে প্রপঞ্চিত ও বিস্তৃত করাই তাঁদের লিখিত গ্রন্থ ও টীকার উদ্দেশ্য। শঙ্করের অন্য কোন শিষ্যের গ্রন্থ পাওয়া যায় না বলে অনেকে মনে করেন। সুরেশ্বরাচার্যের গৃহস্থাশ্রমের নাম ছিল মণ্ডন মিশ্র। কিন্তু সেই মত এখন গ্রাহ্য নহে বলে অনেকে বিবেচনা করছেন। এই প্রসঙ্গে মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ মহোদয় লিখেছেন—

“এতদিন পণ্ডিত-সমাজে এই মত প্রামাণিক বলিয়া গৃহীত হইত। কিন্তু আধুনিক পণ্ডিতগণ বিশেষ পর্যালোচনা করিয়া প্রায় প্রমাণ করিয়াছেন যে সুরেশ্বর ও মণ্ডনমিশ্র একই ব্যক্তি নহেন। মণ্ডন সুরেশ্বর হইতে প্রাচীনতর। অতএব উভয়ের অভেদত্ব বিষয়ে যে মত আছে উহা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মণ্ডন ‘ব্রহ্মসিদ্ধি’ নামক একখানি অতি উৎকৃষ্ট বেদান্তগ্রন্থ রচনা করেন। যদিও এই গ্রন্থ অদ্বৈতসিদ্ধান্তেরই প্রতিপাদক তথাপি এই অদ্বৈতবাদ নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি এবং উপনিষদ্ভাষ্যবার্তিকসকলে সুরেশ্বরাচার্য-প্রতিপাদিত অদ্বৈতবাদ হইতে সর্বৈব ভিন্ন। মাধ্ব সম্প্রদায়ের ‘মণিমঞ্জরী’ নামক গ্রন্থ অনুসারে মণ্ডন ও সুরেশ্বর পৃথক্ লোক বলিয়া বোধ হয়। মণ্ডন সুরেশ্বর হইতে প্রাচীন ছিলেন, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু তিনি শঙ্করের সমসাময়িক ছিলেন অথবা শঙ্কর হইতেও প্রাচীন ছিলেন ইহা নির্ণয় করা কঠিন। প্রসিদ্ধি এই প্রকার যে মণ্ডন কুমারিলের শিষ্য। কিন্তু সুরেশ্বর সাক্ষাৎ অথবা পরম্পরাভাবে কুমারিলের শিষ্য ছিলেন, শ্লোকবার্তিকের ‘মোক্ষার্থী ন প্রবর্ততে’ – ইত্যাদি কারিকা (সম্বন্ধাপেক্ষপরিহার, ১০) উদ্ধৃত করিয়া কুমারিলকে ‘মীমাংসকম্মন্য’ বলিয়াছেন। শিষ্যের গুরুসম্বন্ধে এরূপ আক্ষেপোক্তি সম্ভব নহে। বিধিবিবেক, ভাবনাবিবেক, বিভ্রমবিবেক, মীমাংসানুক্রমণী এবং স্ফোটসিদ্ধি এই সকল গ্রন্থ মণ্ডনমিশ্রকৃত। ………সুরেশ্বর এবং মণ্ডন অভিন্ন ব্যক্তি নহেন এবং ইঁহাদের সিদ্ধান্তও পরস্পরবিরোধী। আনুসঙ্গিকভাবে মণ্ডনের দৃষ্টি হইতে শঙ্কর সম্প্রদায়ের দৃষ্টিকোণের পার্থক্য ইহা হইতে অবগত হওয়া যাইবে। মঠাম্নায়ের মতানুসারে সুরেশ্বরাচার্য দ্বারকা মঠের প্রথম মঠাধ্যক্ষ ছিলেন কিন্তু এ বিষয়ে বহু মতভেদ আছে।”

[কলিকাতা সংস্কৃত মহাবিদ্যালয় গবেষণা গ্রন্থমালা-৩২ “ভারতীয় সাধনার ধারা” পৃষ্ঠা ১৬৩]

মণ্ডনের ব্রহ্মসিদ্ধির উপর বাচস্পতি মিশ্র ‘ব্রহ্মতত্ত্বসমীক্ষা’ নামে টীকা রচনা করেন তা ভামতীতে উল্লিখিত হয়েছে। শাঙ্কর বেদান্তের অদ্বৈত প্রস্থানের বিস্তার বিশাল এবং গভীর হতে গভীরতর। তাই বার্তিককার সুরেশ্বরাচার্য, ব্রহ্মসিদ্ধিকার মণ্ডন, পঞ্চদশীকার বিদ্যারণ্য, ইষ্টসিদ্ধিকার বিজ্ঞানাত্মা, কৌমুদীকার রামদ্বয়াচার্য প্রভৃতি অদ্বৈতবাদী আচার্যগণের বিচারের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য থাকলেও পরম লক্ষ্য সকলেরই অদ্বৈততত্ত্ব নিরূপণ। সেজন্য এই সমস্ত অদ্বৈত বেদান্তের উপর প্রকরণগ্রন্থ, টীকা, টিপ্পনী, ভাষ্য অদ্বৈতবেদান্ত- ভাণ্ডারের বিপুল সম্পদ। শাঙ্কর বেদান্ত এবং অদ্বৈত প্রস্থানের মধ্যে ভামতী-প্রস্থান এবং বিবরণ-প্রস্থানই বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। শঙ্করের পূর্ব্ববর্তী অদ্বৈতবৈদান্তিক গৌড়পাদের নাম প্রসিদ্ধ। তাঁর ‘কারিকা’ শাঙ্করদর্শনের সূত্র বলে অনুমান করা হয়। শঙ্করের পূর্ব্বে ও পরে কোন বৈদান্তিকই শঙ্করের ন্যায় প্রতিভাধর জ্ঞানী বলে এখনও প্রসিদ্ধি লাভ করতে পারেন নাই। সেজন্য শঙ্করের অদ্বৈতদর্শন দার্শনিক জগতে সবার শীর্ষে স্বমহিমায় দীপ্তিমান্। যদিও শঙ্কর প্রাচীন অদ্বৈতবাদের একজন প্রধান আচার্য। শঙ্করের আবির্ভাবের পূর্বে ৪০০ শত বৎসর হতে হাজার বৎসর আগেও যায় ব্রহ্মসূত্রের পর্যালোচনা হয়ে আসছে কিন্তু শঙ্করের প্রজ্ঞা ও বৃদ্ধির সন্নিকটে প্রায় সকলেই নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। অনেকে আবার একেবারেই বিলীন হয়ে গেছেন। ভগবান শঙ্কর বহু কষ্ট স্বীকার করে, অবৈদিক ধারাগুলি এবং তথাকথিত কাপালিক, শৈব, শাক্ত, বৌদ্ধ প্রভৃতি মতগুলিকে যেমন খণ্ডন করে দিয়েছেন তেমনি আবার ভারতবর্ষের বহু স্থানে পদব্রজে পরিভ্রমণ করতঃ ঐসব মতাবলম্বী আচার্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তর্কযুদ্ধে পরাজিত করেন; বহু আচার্যের ধর্মবিষয়ে ভ্রান্ত আচার আচরণ, ভ্রান্ত চিন্তাগুলিও তিনি দূর করে দেন। ইহা তাঁর জগৎ ও জীবের প্রতি অকৃপণ করুণার নিদর্শন। শঙ্কর সর্বত্র জ্ঞানবাদের উপরই জোর দিয়াছেন এবং কর্মবাদ খণ্ডন করেছেন। কারণ বেদ হল জ্ঞান; জ্ঞান স্বপ্রকাশ, নিত্য ও শাশ্বত। ইহাই বেদার্থের মৌল রহস্য। ভগবান ব্যাস ও ভগবান শঙ্কর সেই মৌল দিকটিই ব্রহ্মসূত্রে এবং অদ্বৈতভাষ্যে প্রতিপন্ন করেছেন। এজন্যই জগতে বেদান্তের এত সমাদর। সারস্বত মঠ-প্রতিষ্ঠাতা শঙ্করপন্থী ব্রহ্মবিদ আচার্য সদ্‌গুরু স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী পরমহংসদেব বেদান্তধৰ্ম্মকেই জগতে প্রচার ও প্রসার করার জন্য লক্ষ্য নির্দেশ করে গেছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন- 

“এই উপস্থিত সাম্য ও উদার যুগে বেদান্তধর্ম ব্যতীত আর কোন্ ধৰ্ম্ম সকলের সমানভাবে তৃপ্তি সাধন করিবে? এই জন্য বাংলার সুদূর প্রান্তে এই মঠ স্থাপন করা হইয়াছে। লোকসমাজে কেবল গোলে হরিবোল না দিয়া যাহাতে বেদান্তবিদ্‌ গুরুর বিকাশ হয় তজ্জন্য অনাথ আশ্রম ও মঠের প্রতিষ্ঠা এবং জগদ্‌গুরু তাহার পরিচালক।”

 তিনি নিজ জীবনে যেমন বেদের অপরোক্ষানুভূতি লাভ করেছিলেন, তেমনি সনাতনশাস্ত্রও প্রণয়ন করে গিয়েছেন। অদ্বৈতবেদান্তের প্রকরণ-গ্রন্থ যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণের একটা সারতত্ত্বপূর্ণ গ্রন্থ “বেদান্ত-বিবেক” প্রণয়ন করে যান। তিনি মূলতঃ শঙ্করপন্থী অদ্বৈতবাদী বা ব্রহ্মবাদী আচার্য।

আবার আমরা বেদান্তদর্শনের মৌল বিষয় পর্যালোচনায় মনোনিবেশ করি। বেদবাদের চরম মীমাংসা এই ‘বেদান্ত’। আগেও বলা হয়েছে-বেদান্তের অপর নাম উপনিষদ। উপনিষদে মুনি এবং ঋষিদের শুদ্ধ অন্তঃকরণে তত্ত্বজ্ঞানের সমুজ্জ্বল প্রকাশ পরিদৃষ্ট হয়। এই যে তাঁদের দিব্য কুশলবুদ্ধি ও স্বচ্ছ বোধ তার বিকাশের উপায় দেখা যায় ব্রহ্মবিচার বা অনুশীলন। এজন্য জীবনে ব্রহ্ম-বিচার অপরিহার্য। ব্রহ্মবাদ সেই বেদবাদের দিব্য ফলশ্রুতি। ব্রহ্মবাদের সঙ্গে অদ্বৈতবাদের সম্পর্ক গভীর। আর অদ্বৈতবাদের সঙ্গে শাঙ্কর-দর্শনের সম্পর্ক সম্বন্ধ অভিন্ন। তাই ব্রহ্মবাদের আলোচনা-প্রসঙ্গে শাঙ্কর-দর্শনের কিছু আলোচনা প্রয়োজন।

শাঙ্কর-দর্শনের সংক্ষেপ পরিচিতি- 

আচার্য শঙ্কর তাঁর ভাষ্যে জীব, জগৎ ও আত্মার যথার্থ স্বরূপটি তুলে ধরেছেন, তুলে ধরেছেন বেদান্তের দৃষ্টিসহায়ে। বেদান্তে অনেকগুলি দৃষ্টি আছে তার মধ্যে প্রধান হল অদ্বৈতদৃষ্টি যা অদ্বৈতবাদ। এই অদ্বৈতবাদই অতীব প্রাচীন ও অন্যতম। এই দর্শনে জীব, জগৎ ও ব্রহ্মের স্বরূপ এবং এই তিনের মধ্যে যে পরস্পর সম্বন্ধ তা শাঙ্কর-দর্শনে অপূর্বভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে। সেখানে পরব্রহ্মই একমাত্র সত্য ও নিত্যবস্তু নিরূপিত হয়েছে এবং এই পরিদৃশ্যমান বহু বৈচিত্র্যময় জীব-জগৎ মূলতঃ সত্য নয় কারণ তারা বাধিত হয়ে যায়। পরব্রহ্মই মায়া দ্বারা জীবজগৎরূপে প্রতিভাসিত হচ্ছেন। মূলতঃ ব্রহ্ম স্বরূপে নির্বিশেষ কিন্তু অনাদি অবিদ্যাবশতঃ জীব-জগৎ প্রতিভাত হচ্ছে। আচার্য শঙ্কর বলেন-ইহাই অধ্যাস বা মিথ্যা প্রত্যয়। এক বস্তুতে অন্যবস্তুর অবভাসের নাম অধ্যাস। কিংবা যে যাহা নয় তাকে সেইরূপে যে দেখার বুদ্ধি তা অবশ্যই ভ্রম। তাই শঙ্কর মতে অধ্যাস – ‘অন্যস্য অন্যধর্মাবভাসতাৎ’ বা ‘অধ্যাসো নাম অতস্মিংস্তদ্‌বুদ্ধিঃ’ (অধ্যাসভাষ্য)। এই মায়া বা অবিদ্যা ব্রহ্মবস্তু হতে স্বতন্ত্র বস্তু, ইহা সত্যবস্তু নহে, সম্পূর্ণ মিথ্যা। সত্য একমাত্র পরব্রহ্ম। অদ্বৈতবাদে জীবজগতের মায়িক সত্তা আছে, সেজন্য মায়িক দর্শন হয়। জীবের তাই স্বরূপ সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান আছে-যথার্থ বিজ্ঞান নাই। সেই বিজ্ঞান লাভ করতে হলে যথাশাস্ত্র অনুষ্ঠান চাই। তাতে চিত্তশুদ্ধ হলে জ্ঞান প্রকাশিত হবে। তখন কৰ্ম্মত্যাগ হয়ে যাবে। কারণ কর্ম্ম এবং জ্ঞানে পরস্পর পর্বত প্রমাণ পার্থক্য। এদের দু’য়ে সমুচ্চয় হয় না – ‘ন কর্মণা ন প্রজয়া ধনেন ত্যাগেনৈকেন অমৃতত্বমানশুঃ।’ (কৈবল্য উপঃ ১।১২) অর্থাৎ কর্মবল, জনবল ও ধর্মবলের দ্বারা অমৃতত্ব লাভ করা সম্ভব নয়; একমাত্র ত্যাগের দ্বারাই অমৃতত্ব লাভ সম্ভব। বৃহদারণ্যক উপনিষদেও ঠিক এই কথাই বলা আছে – ‘এতং বৈ তমাত্মানং বিদিত্বা ব্রাহ্মণাঃ পুত্রৈষণায়াশ বিত্তৈষণায়াশ্চ লোকৈষণারাশ্চ ব্যুত্থায়াথ ভিক্ষাচর্যং চরন্তি।’ (৩৩৫।১) জীব মাত্রেরই অধ্যাস বিদ্যমান তাই শরীর- ইন্দ্রিয়াদিতে তারা আত্মবুদ্ধি করে থাকে। এই যে অনাত্ম- বস্তুতে আত্মবোধ ইহার নিবৃত্তির জন্য প্রয়োজন ব্রহ্মবিচার। ইহাই বেদান্তবিচার। শঙ্করের মতে ব্রহ্ম স্বপ্রকাশ এবং আত্মাই ব্রহ্ম। শাস্ত্র যদিও জড় কিন্তু আত্মার প্রকাশে শাস্ত্রের প্রকাশ।

শঙ্কর বলেন, ধর্মের ফল ভিন্ন, ব্রহ্মজিজ্ঞাসার ফল ভিন্ন। অর্থাৎ ধর্ম্মের ফল অভ্যুদয় কিনা স্বর্গাদি লাভ। এই লাভের জন্য সাধনা বা অনুষ্ঠানের প্রয়োজন আছে। কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞানের ফল মুক্তি ইহা সাধ্যবস্তু নহে। ব্রহ্ম নিত্যসিদ্ধ। ধর্ম অনুষ্ঠানে যেখানে বলা হয় ‘এইরূপ ভাবে অনুষ্ঠান সম্পাদন কর’, ‘ঐ প্রকার অনুষ্ঠান কর’ কিন্তু ব্রহ্ম বিষয়ে ঐরূপ আদেশ অচল। সেখানে বলা হয় – “আত্মানং বিদ্ধি”, আত্মাকে জান। এই জানাই অজ্ঞানসংশয়নিবৃত্তির মুখ্য কারণ। তখন আপনা হতেই আত্মবোধ জাগ্রত হয়। শমদমাদি সহায়ে ব্রহ্মবিচারই কর্তব্য কৰ্ম্ম। নিষ্কাম কৰ্ম্মাদিও গৌণসাধন। তাতে বিবেক জাগ্রত হয়। তবে শঙ্কর বলেছেন-ব্রহ্মাত্মজ্ঞান লাভের অধিকারী আছে। যিনি সাধনচতুষ্টয়সম্পন্ন তিনি প্রকৃত অধিকারী। ব্রহ্মজ্ঞানই পরমপুরুষার্থ কিন্তু সংসারনিবৃত্তি একান্তই প্রয়োজন। কারণ অনাদি অজ্ঞানরূপ সংসার-বাসনাই অনর্থের কারণ। এই অনর্থের প্রভাব হতে নিষ্কৃতি পেতে হলে ব্রহ্ম-বিচার ভিন্ন অন্য পথ নাই। ব্রহ্মের স্বরূপ লক্ষণ ও তটস্থ লক্ষণ বিদ্যমান। নিষেধমুখেই মাত্র আত্মজ্ঞানের উন্মেষ হয়। শ্রুতি বা উপনিষদ্ সেই আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞানের প্রমাণ। তাই বেদান্তের প্রতিপাদ্য ব্রহ্ম। এবং নির্বিশেষ ব্রহ্ম প্রতিপাদনই শ্রুতির মুখ্য উদ্দেশ্য। ব্রহ্মসূত্রে আচার্য ব্যাসদেব জীব ও ব্রহ্মের সম্পর্ক সম্বন্ধে যে সিদ্ধান্ত উল্লেখ করেছেন তা অতীব দুর্জেয়, তাই বহু আচার্যই স্ব স্ব মতে ব্যাখ্যা করতে প্রয়াসী হয়েছেন। তবে অদ্বৈতবাদী বৈদান্তিক আচার্যশিরোমণি শঙ্কর মনে করেন জীব ও ব্রহ্মের ভেদ ঔপাধিক মাত্র, অভেদই পারমার্থিক। জীব এক হলেও মায়িক দৃষ্টিতে বহু মনে হতে পারে তা ব্যাসদেব বেদান্তসূত্রে (২।৩/৫২) উল্লেখ করেছেন। এই বহুত্ব যে ঔপাধিক তাও তিনি বেদান্তসূত্রে (৩৩২।১৮-২০) উল্লেখ করেছেন। কাজেই বহু জীবভেদরূপ অধ্যাস বা মিথ্যাজ্ঞান মায়িক-পারমার্থিক নহে, আচার্য শঙ্কর তাঁর ভাষ্যে যুক্তিসহকারে নিরূপণ করেছেন। বেদান্তভাষ্যে তিনি তাই স্পষ্টই বলেছেন- ‘ভেদস্ত উপাধিনিমিত্তো মিথ্যাজ্ঞানকল্পিতো ন পারমার্থিকঃ’- (১/৪/১০)। জীবজগতের ভেদ ব্যাবহারিক সত্তায়, ফলে সাধারণ জীবের তাঁর যথার্থ স্বরূপবোধ নাই। বিদ্বানরাই অনুভব করেন ‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম।’ সংসারী জীব হয় দেহাত্মবাদী, নয় ইন্দ্রিয়াত্মবাদী, তাই ভ্রান্তিজ্ঞান তাদের স্বাভাবিক। এই ভ্রান্তি মোচনের জন্য শ্রুতির অনুকূলে ব্রহ্মজিজ্ঞাসারূপ ব্রহ্মবিচার প্রয়োজন। শ্রুতি ও আচার্য হতে পরোক্ষানুভব হয় আর শ্রবণ-মনন-নিদিধ্যাসন দ্বারা এই আত্মস্বরূপের অপরোক্ষানুভব হয়। শ্রুতির দ্বারাই ব্রহ্ম- বিচার করতে হবে, তা ইন্দ্রিয়দ্বারা সম্ভব নহে কারণ ইন্দ্রিয় ভ্রমাত্মক। অনুমান প্রত্যক্ষের উপর নির্ভর করে। হিসাবে ঋষিদের অপরোক্ষানুভূতিতে যে জ্ঞান প্রত্যক্ষ হয়েছে তাই উপনিষদ শাস্ত্র। শঙ্কর তাই বলেছেন – 

শ্রুত্যাদয়োহনুভবাদয়শ্চ যথাসম্ভবমিহ প্রমাণম্, অনুভবাবসানত্বাৎ ভূতবস্তু বিষয়ত্বাচ্চ ব্রহ্মবিজ্ঞানস্য।’ শঙ্কর জ্ঞান বলতে ব্রহ্মজ্ঞান বা তত্ত্বজ্ঞানকেই লক্ষ্য করেছেন। এই জ্ঞানে ক্রিয়ার কোন অপেক্ষা নাই। অর্থাৎ মোক্ষ কর্মের ফল নয়। (শঙ্করভাষ্য-১।১।১২) কারণ ব্রহ্ম স্বাত্মস্বরূপ। ফলে কর্ম অজ্ঞানের ফল, চৈতন্যই জ্ঞানের ফল, মোক্ষই ধৰ্ম্ম, অনুভূতিই লক্ষ্য। আত্মা সকল জ্ঞানের আশ্রয় এবং আত্মা স্বতঃসিদ্ধ-স্বয়ং সিদ্ধত্বাৎ। জ্ঞানই স্বরূপ। যা সৎ তাই চিৎ ও আনন্দ। সেই আত্মার উৎপত্তি ও বিনাশ নাই। আত্মা যে বন্ধনদশা অনুভব করে, তা অজ্ঞানের ফলে। আত্মা নিত্যমুক্ত।

শঙ্করের মতে জগতের নিমিত্ত ও উপাদান কারণ ঈশ্বর। সমষ্টি-উপহিত ঈশ্বর সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। পারমার্থিক দৃষ্টিতে ঈশ্বর ও ব্রহ্ম অভিন্ন। ( ব্রঃ সূঃ ভাষ্য ২।১।১৪) পরব্রহ্মকে যখন জগৎস্রষ্টা রূপে দর্শন করি তখন তিনি সগুণ ব্রহ্ম-দ্বিরূপং হি ব্রহ্মাবগম্যতে, নাম-রূপ-বিকার- ভেদোপাধি-বিশিষ্টং, তদ্বিপরীতং সর্বোপাধিবর্জিতম্। এখানে সগুণব্রহ্ম ঈশ্বরই চেতন এবং নিরুপাধিক ব্রহ্মই নির্গুণ। সৃজন প্রক্রিয়া মহিমা এই ভাবেই প্রতিভাত হয়। এখানে ব্রহ্ম যখন মায়াযুক্ত তখন ঈশ্বর। এই ঈশ্বর সকল সৃষ্টির অধিপতি, তিনি সৃষ্টিতে অনুস্থ্যতও। কিন্তু জীবরূপে এবং ঈশ্বররূপে তার গুণাবলী পার্থক্য আছে। ঈশ্বর প্রয়োজনে মায়াযুক্ত হয়েও মায়াধীন। তাঁর উপর মায়ার প্রভাব নাই, তিনি মায়ার সাক্ষী মাত্র। কিন্তু জীব অবিদ্যাযুক্ত। সগুণব্রহ্ম ঈশ্বর ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেন তবে তিনি অনাসক্ত অর্থাৎ তাঁর কিছুতেই আসক্তি নাই। (গীতা শঃ ভাষ্য, উপক্রমণিকা) মায়াকে বলা হয় তার শক্তি। তিনি সৃষ্টির উপাদান ও নিমিত্ত কারণ। (শ্বেতা-৪/১০) এই জগৎ আত্মারই বিষয়ীভূত-আত্মা বা চৈতন্যকে পরিহার করলে জগৎ অসৎ। অসৎ অর্থাৎ কিছুই থাকে না। কিন্তু জগৎ থাকে কারণ ব্রহ্মের পারমার্থিক সত্তা আছে বলে। কাজেই ব্রহ্মের উপর জগৎ নির্ভর করে, জগতের উপর ব্রহ্ম নির্ভর করে না। জগৎ-রূপের প্রকাশের কারণ মায়া। এই ‘মায়া’ অনির্বচনীয়া। আবার বলা হচ্ছে, ঈশ্বর যে শক্তি সহায়ে নিজেই নিজেকে প্রকট করেন সেই শক্তি ‘মায়া’। এই শক্তিই ঈশ্বরের উপাধির কারণ। ঈশ্বর অবিকৃত থেকেই তাঁর মায়াশক্তিদ্বারা অবতার-মুর্ত্তি পরিগ্রহপূর্ব্বক জীবগণের উদ্ধার করেন।

আত্মা (জীব-চৈতন্য) ও অনাত্মায় (জড়) সংবিজড়িত জীব। এই ছয়ের স্বরূপ সাধারণের দৃষ্টিতে অস্পষ্ট। কারণ পূর্ণজ্ঞান না থাকায় ব্রহ্মকে জীবরূপে ভাবা হয়-ইহাই অধ্যাস। এই অধ্যাসের জন্যই আমরা মনে করি জীব জন্ম পরিগ্রহ করছে, জীবের মৃত্যু হচ্ছে। এইরূপ চিন্তা ভ্রান্ত। অবিদ্যার উপাধিগুলিই মাত্র জন্মিতেছে বা ক্ষয় হচ্ছে। সর্ব-উপাধিবর্জিত জীব হল সাক্ষী। এই সাক্ষীই হল শুদ্ধ-বিজ্ঞান। শুদ্ধ বিজ্ঞান আর স্বরূপ জ্ঞান এক।

এই হল-শঙ্কর-মতে জীবজগৎ এবং আত্মা তথা ব্রহ্মতত্ত্ব সম্পর্কে সংক্ষেপ পরিচিতি। এর পর আমাদের শঙ্করভাষ্যের অনুবর্তী আচার্যদের দৃষ্টিতে শঙ্করদর্শনের অদ্বৈতবাদ তথা ব্রহ্মবাদ বুঝতে হবে। কারণ ভগবান শঙ্করাচার্যের ভাষ্য সরল বলে মনে হলেও গভীর এবং গম্ভীর। ফলে অদ্বৈতবাদী আচার্যবর্গ শঙ্করভাষ্যের টীকা- টিপ্পনীর মাধ্যমে যে তাৎপর্য নির্ণয় করেছেন তার মধ্যে অনেক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম চিন্তার পার্থক্য পরিদৃষ্ট হয়। ঐ সমস্ত সূক্ষ্ম তাৎপর্যগুলি উপেক্ষণীয় নয় বলে শঙ্কর-ভাষ্যে তিনটী প্রস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সেই তিনটি হল – বিবরণপ্রস্থান, ভামতীপ্রস্থান ও সংক্ষেপ শারীরকপ্রস্থান। প্রস্থানগুলির সঙ্গে কিছু পরিচয় না থাকলে অদ্বৈতভাষ্য তথা বেদান্তের ব্রহ্মবাদ অবগত হওয়া একেবারেই অসম্ভব। ব্রহ্মানন্দ সরস্বতী ন্যায়রত্নাবলীর টীকায় বেদান্তশাস্ত্রের যে পরিচয় দিয়েছেন তা হল – বেদান্তশাস্ত্রেতি শারীরকমীমাংসারূপ চতুরধ্যায়ী তদ্‌ভাষ্য-তদীয় টীকা-বাচস্পত্য-তদীয় টীকা-কল্পতরু তদীয় টীকা-পরিমলরূপগ্রন্থপঞ্চকেত্যর্থঃ- অর্থাৎ ব্রহ্মসূত্র, শঙ্করের অদ্বৈতভাষ্য, বাচস্পতির টীকা ভামতী, অমলানন্দের ভামতীর টীকা কল্পতরু, অপ্যয়দীক্ষিতের কল্পতরু টীকা ও বেদান্তকল্পতরুপরিমল-এই পাঁচখানি গ্রন্থ বেদান্ত বলে প্রসিদ্ধ।

শঙ্করের সাক্ষাৎ শিষ্য পদ্মপাদাচার্য্য শঙ্করভাষ্যের উপর অতি গম্ভীর যে টীকা রচনা করেন তার নাম ‘পঞ্চপাদিকা’। ‘পঞ্চপাদিকা’ রচিত হওয়ার বহু কাল পরে অর্থাৎ খৃষ্টীয় ১১শ শতাব্দীতে প্রকাশাত্ম যতি পঞ্চপাদিকার টীকা রচনা করেন, তার নামই পঞ্চপাদিকা-বিবরণ। এই টীকার মতাদর্শকেই “বিবরণ-প্রস্থান” বলা হয়। এই টীকা অদ্বৈত- বাদের গ্রন্থগুলির মধ্যে যুগান্তরকারী রচনা। এই পঞ্চপাদিকা বিবরণকে সংক্ষেপ-বিবরণও বলা হয়। অদ্বৈত- বাদের সুক্ষ্মতম চিন্তার ব্যাপক বিশ্লেষণ থাকার জন্যই এই টীকা বিবরণ-প্রস্থান নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। অবশ্য পঞ্চপাদিকা বিবরণের উপর আরো টীকা গ্রন্থ হয়েছে। সর্বজ্ঞ বিষ্ণুভট্টের ঋজু বিবরণ, অখণ্ডানন্দের তত্ত্বদীপন, চিৎ- সুখীর তাৎপর্যদীপিকা প্রভৃতি। পঞ্চপাদিকা নামাকরণ নিয়ে বহু তত্ত্বালোচনা হয়েছে। 

প্রকাশাত্ম যতির বিবরণ-প্রস্থান রচনার বহু পুর্বে খৃষ্টীয় ৯ম শতাব্দীতে ব্রহ্মসূত্রের শাঙ্কর ভাষ্যের যে টীকা বাচস্পতি মিশ্র প্রণয়ন করেন তা গভীর তাৎপর্যবহ। এই টীকা পঞ্চপাদিকাকে অনুসরণ না করেও অনুপম অভিনব। এই টীকার নামই – ‘ভামতী’। বাচস্পতি মিশ্র অন্যান্য কয়েকটি টীকা-গ্রন্থ রচনা করেছেন, তবে ‘ভামতী’ নামে শাঙ্কর ভাষ্যের টীকাই অদ্বৈত বেদান্তে অধিক সম্মান লাভ করেছে। অদ্বৈত বেদান্তের আলোচনায় এই দুই পন্থীই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছেন। এই দুই প্রস্থানের মধ্যে চরম ও পরম তাৎপর্যে কোন ভেদ না থাকলেও চিন্তা-ভাবনার পার্থক্য আছে যা ব্রহ্মতত্ত্ব পরিচিন্তনের পক্ষে বা তত্ত্বাবধারণের পক্ষে সহজ। অদ্বৈত্তত্ত্বের তথা ব্রহ্মতত্ত্বের উপপাদক কিছু কিছু প্রমেয়ের বিচারে পরস্পরের মতপার্থক্য ছাড়া উভয়ে একই তত্ত্বলক্ষ্যের নির্ণায়ক। উভয়ের মতানৈক্য সংক্ষেপে নিম্নে দেওয়া হল – ভামতীকারের মতে ব্রহ্ম-বিচারের মুলীভূতা হল অধয়নবিধিপ্রযুক্ত – ‘স্বাধ্যায়ো ধ্যেতব্যঃ’। শ্রোতব্য বিধিপ্রযুক্ত নহে। কিন্তু বিবরণকার বলছেন – ব্রহ্মবিচারের মূলীভূতা শ্রবণ বিধিযুক্ত, অধ্যয়ন বিধিযুক্ত নহে। ভামতীকারের মতে কর্ম বেদনেচ্ছার হেতু, বেদনের হেতু নয়। বিবরণকারের মতে কর্ম বেদনের হেতু, বেদনেচ্ছার হেতু নয়। ভামতীকারের মতে – ‘মনসঃ ইন্দ্রিয়ত্বম্’ অর্থাৎ মন ইন্দ্রিয়; অনিন্দ্রিয় নহে; বিবরণকারের মতে – মনসঃ ইন্দ্রিয়ত্বং নাস্তি – মন অনিন্দ্রিয় অর্থাৎ ইন্দ্রিয় নহে। ভামতীকারের মতে শ্রবণটি জ্ঞান যাহা মানসক্রিয়ারূপ বিচারবিশেষ শ্রবণাদীনাং মধ্যে নিদিধ্যাসনস্য প্রাধান্যম। বিবরণকারের মতে শ্রবণটি মানস ক্রিয়ারূপ বিচারবিশেষ জ্ঞান নহে, সেজন্য উহা বিধেয়, অবিধেয় নয়, উহা মনন ও নিদিধ্যাসনের অঙ্গী, অঙ্গ নহে। ভামতীকারের মতে জীব অন্তঃকরণাবচ্ছিন্ন চৈতন্য, অবিদ্যায় প্রতিবিম্বিত চৈতন্য নয়। বিবরণকারের মতে জীব অবিদ্যায় প্রতিবিম্বিত চৈতন্য। ভামতীকারের মতে জীব স্বরূপ বিষয়ে অবচ্ছেদবাদ, বিবরণকারের মতে জীব স্বরূপ বিষয়ে প্রতিবিম্ববাদ। ভামতীকারের মতে অজ্ঞানাশ্রয় জীব, বিবরণকারের মতে অজ্ঞানাশ্রয় ব্রহ্ম। ভামতীকারের মতে – প্রতি জীবং মূলাবিদ্যায়া নানাত্বম্ অর্থাৎ অজ্ঞান জীবের নানা ভেদ, এক নহে, বিবরণকারে মতে – মূলাবিদ্যা একৈব। অজ্ঞান এক, নানা নহে। ভামতীকারের মতে উপহিত ব্রহ্ম বৃত্তির বিষয় – অবিষয় নহে – উপহিতং ব্রহ্মৈব বৃত্তের্বিষয়ঃ। বিবরণকারের মতে উপহিত ব্রহ্ম বৃত্তির বিষয় নহে – শুদ্ধং ব্রহ্মাপি বৃত্তের্বিষয়ঃ। । ভামতীকারের মতে স্বাধ্যায়বিধির ফল অর্থের অববোধ – ‘অর্থাববোধফলকঃ।’ বিবরণকারের মতে অধ্যয়ন বিধির ফল অক্ষরের গ্রহণ, অর্থের অববোধ নহে – ‘অক্ষরাবাপ্তিমাত্রফলকঃ’। ভামতীকারের মতে ভূতসকল ত্রিবৃৎকৃত, পঞ্চীকৃত নহে। বিবরণকারের মতে ভূতগুলি পঞ্চীকৃত, ত্রিবিৎকৃত নহে। ভামতীকারের মতে সাদৃশ্যটি অধ্যাসের কারণ, বিবরণকারের মতে সাদৃশ্যটি অধ্যাসের অকারণ, কারণ নহে। ভামতীকারের ষতে শব্দ পরোক্ষ জ্ঞানের জনক – ‘শাব্দ পরোক্ষবাদো নাঙ্গীক্রিয়তে।’ বিবরণকারের মতে শব্দ হল অপরোক্ষজ্ঞানেরও কারণ, কেবল পরোক্ষজ্ঞানের কারণ নহে। ভামতীকারের মতে স্বাপ্ন প্রপঞ্চ মনের পরিণাম, বিবরণ- কারের মতে স্বাপ্ন অবিদ্যার পরিণাম – মনের পরিণাম নহে। এই প্রকার আরো কিছু কিছু অদ্বৈতসিদ্ধান্তের চিন্তার মধ্যে পার্থক্য আছে। সংক্ষেপ-শারীরক প্রস্থানের সঙ্গে আবার এই দুই মতের পার্থক্য আছে। তবে এগুলি অদ্বৈত সিদ্ধান্তের পরিচিন্তনের সহায়ক, এজন্যই প্রস্থানভেদ। এগুলি আপাততঃ মনে হতে পারে বিরোধী কিন্তু ইহা বিরোধী নহে মোটেই – কারণ পরম ও চরম তাৎপর্যে অর্থাৎ অদ্বৈতসিদ্ধান্তে সকলেই এক। এই সিদ্ধান্তে অনুপ্রবিষ্ট হতে পারলে ইহা গভীর রসাত্মক বলে অনুভূত হবে। বেদান্তদর্শনের এই প্রকার সূক্ষ্ম তত্ত্বের বিচার- বিশ্লেষণের দ্বারা বিভিন্ন শাখা প্রশাখা সম্প্রদায় সৃষ্টি হয়েছে। তবে বেদান্তে ব্রহ্মতত্ত্ব প্রতিপাদক-অধ্যাত্মতত্ত্ব প্রতিপাদক অদ্বৈত সিদ্ধান্তটা আমাদের পর্যালোচনার বিষয়। এই অদ্বৈত সিদ্ধান্তের যে দু’টা প্রস্থানের কথা বলা হল, তারাই অদ্বৈতবেদান্তে যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করেছে। এই সমস্ত প্রস্থানগুলির উদ্দেশ্য জগৎ জীব ও আত্মার যথার্থ স্বরূপতত্ত্ব নির্দ্ধারণ। শঙ্কর নিজেই বলেছেন জীবের স্বরূপ তিন প্রকারে নিরূপণ করা যেতে পারে-বিশ্ব-প্রতিবিম্ববাদ সহায়ে, অবচ্ছেদবাদ বা চিদাভাস সহায়ে এবং স্বপ্ন- কল্পিতবাদ সহায়ে। এখানে তিনটী বাদের কথা শঙ্কর বললেও আভাসবাদকে ধরে চারটি বাদই বুঝিয়ে থাকে। যেমন-

অবচ্ছিন্নশ্চিদাভাসস্তৃতীয়ঃ স্বপ্নকল্পিতঃ।

বিজ্ঞেয়স্ত্রিবিধ জীবস্তত্রাদ্যঃ পারমার্থিকঃ ॥

-বাক্যসুধা ৩২

ফলে শঙ্করের অদ্বৈত ব্রহ্মবাদ যে যে যুক্তিসিদ্ধভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অর্থাৎ যে যে ভাবে জীব-জগতের সহিত ব্রহ্মের অভেদত্ব সিদ্ধ হয়েছে সেই সেই অদ্বৈতসিদ্ধান্তগুলি মুমুক্ষু ব্যক্তিদের পরিজ্ঞাত হওয়া একান্তই প্রয়োজন।

~ শেয়ার করুন ~

পড়ে কেমন লাগলো? আপনার মন্তব্য জানান।

Responses

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Home
Timeline
Articles
Library
Login